মুহাম্মদ আব্দুল্লাহহেল কাফী: Abdullahil Kafi al-Quraishi Books

মুহাম্মদ আবদুল্লাহ-হিল কাফি

✍️ বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ | আহলে হাদিস আন্দোলনের নেতা | লেখক ও সম্পাদক

মুহাম্মদ আবদুল্লাহ-হিল কাফি (১৯০০–১৯৬০) ছিলেন উপমহাদেশের এক প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ, গবেষক, সংগঠক ও দাওয়াতি আন্দোলনের পথিকৃৎ ব্যক্তিত্ব। তাঁর লেখনী, গবেষণা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং ইসলামের প্রতি গভীর অঙ্গীকার তাঁকে আলাদা মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করেছে। সমাজ সংস্কার, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, গবেষণা ও দাওয়াহ—সব ক্ষেত্রে তিনি রেখেছেন উল্লেখযোগ্য অবদান, যা আজও গবেষক ও পাঠকদের অনুপ্রেরণা যোগায়।

“যে জাতি ইসলামের মূলনীতি থেকে বিচ্যুত হয়, সে জাতি কখনো প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে না।” – মুহাম্মদ আবদুল্লাহ-হিল কাফি

প্রারম্ভিক জীবন

১৯০০ সালে বর্ধমান জেলার টুবগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মুহাম্মদ আবদুল্লাহ-হিল কাফি। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল দিনাজপুর জেলার বস্তিয়াড়া গ্রামে। ছোটবেলাতেই তিনি আরবি, উর্দু এবং ফারসি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। পিতা সৈয়দ আবদুল হাদি ছিলেন জ্ঞানঅন্বেষী ও ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি, যিনি ছেলেকে ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার প্রতি উৎসাহিত করতেন। মায়ের কাছ থেকেও তিনি ভাষা ও সাহিত্যচর্চার প্রাথমিক অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন।

শিক্ষাজীবন

কাফির শিক্ষাজীবন শুরু হয় বাড়িতে প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে। পরে নূরুল হুদা মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে তিনি কুরআন, ফিকহ, হাদিস ও তাফসিরে পারদর্শিতা অর্জন করেন। এরপর বিদ্যালয় পর্যায়ে রংপুর ও হুগলি স্কুলে লেখাপড়া করেন। ১৯১৭ সালে কলকাতা মাদ্রাসায় এন্ট্রান্স সম্পন্ন করে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি হন। উচ্চশিক্ষার মাঝপথে অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনের প্রভাবে ইংরেজি শিক্ষা ত্যাগ করেন এবং জাতীয় আন্দোলনে যুক্ত হন।

“শিক্ষা কেবল জ্ঞানের বাহন নয়, এটি আদর্শ ও আত্মত্যাগের চেতনা জাগায়।” – কাফি

রাজনৈতিক জীবন

মুহাম্মদ আবদুল্লাহ-হিল কাফির রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয় অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ১৯২২ সালে তিনি জমিয়তে উলামায়ে বাঙ্গালার সহকারী সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ইন্ডিপেন্ডেন্ট মুসলিম পার্টিতে যোগ দিয়ে দলের সেক্রেটারি ও নির্বাচন বোর্ডের সদস্য হিসেবে কাজ করেন। ১৯৩০ সালে মুসলিম ন্যাশনাল পার্টির নেতা হিসেবে আইন অমান্য আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় তাঁকে দুই বছর কারাবরণ করতে হয়। কারামুক্তির পর তিনি রাজনীতি থেকে সরে এসে দাওয়াহ ও সমাজ সংস্কারে মনোনিবেশ করেন।

ইসলামি কর্মকাণ্ড

রাজনীতি ছেড়ে ইসলামি কর্মকাণ্ডে আত্মনিয়োগ করার পর কাফি আরও বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৩৫ সালের উত্তরবঙ্গ আহলে হাদিস সম্মেলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪০ সালের দিল্লি সম্মেলনসহ ১৯৪৪ ও ১৯৪৫ সালের নিখিল ভারত আহলে হাদিস সম্মেলনে তিনি বাংলার প্রধান প্রতিনিধি ছিলেন। ১৯৪৬ সালে নিখিল বঙ্গ ও আসাম জমিয়তে আহলে হাদিসের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে আন্দোলনকে তৃণমূলে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর সংগঠনের পুনর্গঠনেও তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

সম্পাদকীয় ও সাংবাদিকতা

কাফি ছিলেন একজন দক্ষ সম্পাদক, প্রখর লেখক ও বিশ্লেষক। ১৯২১ সালে উর্দু দৈনিক “জামানা” পত্রিকার মাধ্যমে তাঁর সম্পাদকীয় জীবনের সূচনা। পরে ১৯২৪ সালে তিনি প্রকাশ করেন সাপ্তাহিক “সত্যাগ্রহী”, যা মুসলিম সমাজে রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনাকে জাগিয়ে তোলে। ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত “আরাফাত” এবং ১৯৪৯ সালে শুরু হওয়া “তর্জমানুল হাদিস” পত্রিকা তাঁর দাওয়াহ কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল।

“কলমই সমাজ পরিবর্তনের সর্বশ্রেষ্ঠ হাতিয়ার।” – আবদুল্লাহ-হিল কাফি

রচনাবলী ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান

তিনি জীবদ্দশায় মোট ২৬টি গ্রন্থ রচনা করেন, যেগুলোতে ইসলামি শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতি, তাওহিদ, সমাজনীতি ও ধর্মীয় সংস্কারের মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহ

  • ইসলামী শাসনতন্ত্রের সূত্র
  • নবুওতে মোহাম্মদী
  • আহলে হাদিস পরিচিতি
  • আল-ইসলাম ও কমিউনিজম
  • ধন বণ্টনের রকমারি ফর্মুলা

প্রভাব ও উত্তরাধিকার

মুহাম্মদ আবদুল্লাহ-হিল কাফি ছিলেন এমন এক নেতৃত্বশীল চিন্তাবিদ যিনি ধর্মীয় সততা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং সামাজিক দায়িত্বের সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। আহলে হাদিস আন্দোলনকে তিনি বাংলার গ্রাম-গঞ্জ পর্যন্ত ছড়িয়ে দেন। তাঁর আহ্বান ছিল ঐক্য, শুদ্ধ আকিদা, দৃঢ় চরিত্র এবং ইসলামি আদর্শের প্রতি ফিরে যাওয়া।

মৃত্যু

১৯৬০ সালে ঢাকায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর প্রস্থান উপমহাদেশের ইসলামি চিন্তা ও গবেষণার ক্ষেত্রে এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করে। তবে তাঁর দাওয়াহ, নেতৃত্ব ও রচনাসমূহ নতুন প্রজন্মকে এখনো অনুপ্রাণিত করছে।

“একজন আলেমের প্রকৃত জীবন শেষ হয় না; তার চিন্তা ও কলম প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকে।”

উপসংহার

মুহাম্মদ আবদুল্লাহ-হিল কাফি ছিলেন শিক্ষা, দাওয়াহ, গবেষণা ও সমাজ নেতৃত্বের সমন্বিত প্রতীক। তাঁর জীবন দেখায় যে ইসলামী মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়েও সমাজ সংস্কার, গবেষণা ও জাতীয় নেতৃত্ব গড়ে তোলা সম্ভব। তাঁর রচনাবলী আজও ইসলামি চিন্তার ভাণ্ডারে অনন্য অবদান হিসেবে বিবেচিত হয়।

আরও পড়ুন

👉 ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম
👉 ইকবাল হোছেন মাছুম

📥 পিডিএফ ডাউনলোড

মুহাম্মদ আব্দুল্লাহহেল কাফী কর্তৃক রচিত ইসলামিক pdf বই ডাউনলোড করতে নিচে নামের উপর ক্লিক করুন।

১। আল ইসলাম বনাম কমিউনিজম
২। আল্লামা মুহাম্মদ নাসিরুদ্দিন আলিবানী এর জীবনী
৩। একটি পত্রের জবাব
৪। কালেমা ত্যাইয়েবা
৫। তিন তালাক প্রসঙ্গ
৬। নবুয়াতি মুহাম্মাদী
৭। ফিরকাবন্দি বনাম অনুসরণীয় ইমামগণের নীতি

সংগ্রহ: বইগুলি আপনার ভালো লাগলে দয়াকরে নিকটবর্তী লাইব্রেরী থেকে ক্রয় করুন।
আবার ভিজিট করবেন !!! ধন্যবাদ 💚
error: Content is protected !!
Scroll to Top